বর্ষীয়ান নেতা মান্নান ভূঁইয়ার ১২তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন

আশিকুর রহমান, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি: বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, বর্ষীয়ান নেতা ও বীর মক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাবেক মহাসচিব (বহিস্কৃত) সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী ও নরসিংদীর শিবপুর আসনের বিএনপি থেকে চারবার সংসদ সদস্য জাতীয় নেতা প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার ১২ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেছেন বিএনপিসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।

বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) সকালে শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার সমাধিস্থলে পুস্পস্তবর্ক অর্পণ, কবর জিয়ারত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এসময় সমাধিস্হলে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন নরসিংদী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মনজুর এলাহী, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া স্মৃতি সংসদের সভাপতি আবুল হারিছ রিকাবদার, আব্দুল

মান্নান ভূইয়া পরিষদের সদস্য সচিব ও শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু ছালেক রিকাবদার, পৌর বিএনপির সভাপতি এডভোকেট মাহমুদুল হাসান বাবুল, স্থানীয় এলজিইডি’র কর্মচারীবৃন্দ ও আব্দুল মান্নান ভূইয়া আদর্শ বিদ্যাপীঠসহ বিভিন্ন সংগঠন।

উল্লেখ্য আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ২০১০ সালের ২৮ জুলাই মারা যান। ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ নরসিংদীর মনোহরদীর চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের আসাদনগর গ্রামে নানার বাড়ীতে তাঁর জন্ম। তাঁর পৈতৃক বাড়ী শিবপুর উপজেলার মাছিমপুর গ্রামে। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কিংবদন্তি এক পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়-এর সাবেক মন্ত্রী এবং বিএনপির সাবেক মহাসচিব ছিলেন।

সুষ্ঠ ধারার রাজনীতির কুশীলব ছিলেন আমৃত্যু। বিরোধী দল ও মতের প্রতি তিনি সদা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সরকারী কর্মকর্তাদের কাছে তিনি ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু। ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন মান্নান ভূঁইয়া। ছাত্র ইউনিয়ন দিয়ে তার ছাত্র রাজনীতির যাত্রা শুরু। এই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পরীক্ষার আগে তাকে গ্রেপ্তার হয়ে বেশ কিছুদিন কারাবরণ করতে হয়।

১৯৬০ সালে মান্নান ভূঁইয়া নরসিংদী কলেজ ছাত্র সংসদে সমাজসেবা সম্পাদক নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ১৯৬২ সালে তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তী দুই বছর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৪-৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ছাত্র জীবন শেষে মান্নান ভূঁইয়া মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ এ যোগ দেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দীর্ঘদিন। গ্রামাঞ্চলে অবহেলিত কৃষকদের উন্নয়নে তার নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো। ন্যাপ থেকে মান্নান ভূঁইয়া ১৯৭৮ সালে ইউনাটেড পিপলস পার্টির (ইউপিপি) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এরপর প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অণুরোধে ১৯৮০ সালে মান্নান ভূঁইয়া বিএনপিতে যোগ দেন। জিয়া তাকে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের আহবায়ক মনোনীত করেন। তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি বিষয়ক সম্পাদকও ছিলেন। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি বিএনপির অন্যতম রূপকারও ছিলেন। ১৯৮৮ সালে থেকে মান্নান ভূঁইয়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন ৯৬ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত।

৯৬ সালের ২৬ জুন খালেদা জিয়া তাকে দলের মহাসচিব মনোনীত করেন। টানা ১১ বছর মান্নান ভূঁইয়া বিএনপির মহাসচিব ছিলেন। পঞ্চম জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে তিনি টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের শ্রম ও জনশক্তি এবং পরে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।

জোট সরকারের তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ছিলেন। ১/১১ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জরুরি অবস্থার সময় দলের পক্ষ থেকে সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করলে খালেদা জিয়া ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মহাসচিব পদ এবং দল থেকে মান্না ভুঁইয়াকে বহিষ্কার করেন।

আবদুল মান্নান ভূঁইয়া দেশের সবক’টি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেন এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেশের কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে লিয়াজু রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সকল দলের নেতাকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে তিনি সাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ব্যক্তিজীবনে মান্নান ভূঁইয়া দুই ছেলের জনক। বড় ছেলে ভূঁইয়া অনিন্দ মোহায়েমেন রাজন এবং ছোট ছেলে ভূঁইয়া নন্দিত নাহিয়ান স্বজন। স্ত্রী অধ্যাপক মরিয়ম বেগম ঢাকা কলেজে অধ্যক্ষ থাকাকালে অবসরে যান এবং পরে তিনিও ২০২১ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারী মারা যান।